TURNER IT SOLUTION

সোমবার ২২ জানুয়ারী ২০১৮ || সময়- ১১:০৫ am

Warning: include(usbd/config/connect2.php) [function.include]: failed to open stream: No such file or directory in /home/onn24/public_html/details.php on line 82

Warning: include(usbd/config/connect2.php) [function.include]: failed to open stream: No such file or directory in /home/onn24/public_html/details.php on line 82

Warning: include() [function.include]: Failed opening 'usbd/config/connect2.php' for inclusion (include_path='.:/usr/lib/php:/usr/local/lib/php') in /home/onn24/public_html/details.php on line 82

Warning: mysql_num_rows() expects parameter 1 to be resource, boolean given in /home/onn24/public_html/details.php on line 84

জহির রায়হানের রাজাকারি পরিণতি কেন

  • জহির রায়হানের রাজাকারি পরিণতি কেন

    জহির রায়হানের রাজাকারি পরিণতি কেন

সিরাজী এম আর মোস্তাকঃ ৩১ জানুয়ারী, ১৯৭২ পাক হানাদারমুক্ত সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশ থেকে অসংখ্য কৃতিত্বের অধিকারী ক্ষণজন্মা লেখক জহির রায়হান চিরতরে হারিয়ে গেছেন। তিনি ছিলেন একইসাথে অভিনেতা, চলচ্চিত্র পরিচালক, ঔপন্যাসিক, গল্পকার, লেখক, সাংবাদিক ও মুক্তিযুদ্ধে মুজিবনগর সরকারের সংগ্রামী প্রতিনিধি বিশেষ। তার অমর কৃতিত্বসমূহ আজও তাকে স্মরণ করতে বাধ্য করে। তার শেষ পরিণতিটা ছিল একেবারেই অকল্পনীয়। প্রত্যক্ষ দৃশ্য ও সমসাময়িক ঘটনা বিশ্লেষণে স্পষ্ট হয় যে, তিনি রাজাকারি পরিণতি ভোগ করেছেন।


এখানে ১৯৭১ সালের ১৯ ডিসেম্বরে রাজাকার হত্যাকান্ডের একটি প্রত্যক্ষ দৃশ্য দেয়া হয়েছে। এটি ১৯৭১ সালে বিজয়ের প্রাক্কালে রাজাকার হত্যার নামে বুদ্ধিজীবী নিধনের অতি সাধারণ একটি নমুনা মাত্র। (এর অনলাইন ভিডিও দেখতে এখানে- https://www.youtube.com/watch?v=Ep8fNT4-A9g)|। তথাকথিত ভারতীয় রাজাকার তথা মুক্তিযোদ্ধাদের হাতেই এ ধরণের হত্যাকাণ্ড সংঘটিত হয়েছে। তাদের নারকীয় তান্ডবে দেশের হাজার হাজার বুদ্ধিজীবী, লেখক, রাজনীতিক ও গবেষক এমনি অসহায় রাজাকারি পরিণতি ভোগ করেছেন। স্বয়ং জহির রায়হানও একই পরিণতির শিকার। দেশের অসংখ্য পরিবার আজও সে ক্ষত বহন করে চলেছে। তবে অনেক শহীদ পরিবারের সদস্যরা ক্ষত ভূলে ঘাতকদের সাথে গা ভাসিয়ে দিয়েছে। আর ঘাতকেরা দোর্দন্ত প্রতাপে নিজেদেরকে খেতাবধারী মুক্তিযোদ্ধা পরিচয় দিচ্ছে। তারা মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস ইচ্ছেমতো বিকৃত করছে। মুক্তিযোদ্ধা কোটা নামে অবৈধভাবে রাষ্ট্রীয় সকল সুযোগ-সুবিধা কুক্ষিগত করছে। জহির রায়হানের মতো খ্যাতনামা বুদ্ধিজীবীদেরকে রাজাকার হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এমনকি তারা আজও যুদ্ধাপরাধের বিচারের নামে বুদ্ধিজীবীদেরকে হত্যা করে চিত্রে উল্লেখিত দৃশ্যের ন্যায় লাশের জন্য মরিয়া হয়ে উঠেছে। তারা অজ্ঞ ও উম্মত্ত যুবকদের দ্বারা ‘গণজাগরণ মঞ্চ’ গঠন করেছে।


৩১ জানুয়ারী, ২০১৬ অকৃতজ্ঞ সন্তানদের প্রতি লেখক জহির রায়হানের বিদেহী আত্মার গগনবিদারি অস্ফুট প্রলাপ শোনার দিন। তার নিখোঁজের কারণ তদন্ত হয়নি। তবে সে সম্পর্কে অসংখ্য বর্ণনা রয়েছে। এখানে কতিপয় বর্ণনা উল্লেখ করা হলোঃ-
দৈনিক আমার সংবাদ ২৪.কম পত্রিকায় সোমবার, ১৬ই ডিসেম্বর, ২০১৩ ইং তারিখে ‘দৈনিক বাংলাদেশ প্রতিদিন’ পত্রিকার বরাত দিয়ে উল্লেখ হয়, “নেতাদের গোপন ডকুমেন্ট প্রকাশের ভয়ে খুন হয়েছিলেন জহির রায়হান”। সেখাসে বিস্তারিত উল্লেখ হয়, জহির রায়হান একদিন প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “যারা এখন বড় বড় কথা বলেন, নিজেদের বড় নেতা মনে করেন, তাদের কীর্তি-কাহিনী, কলকাতায় কে কি করেছিলেন, তার ডকুমেন্ট আমার কাছে রয়েছে। তাদের মুখোশ আমি খুলে দেব।”


সেই থেকে তিনি নিখোঁজ হন। সেই থেকে আজও নিরুদ্ধেশ। এ প্রসঙ্গে নিউইয়র্কের বাংলা পত্রিকা ‘ঠিকানা’র সঙ্গে সম্প্রতি মন খুলে বলা অনেক কথা বলেছেন, জহির রায়হানের স্ত্রী অভিনেত্রী কোহিনূর আক্তার সুচন্দা ও তার বোন ফরিদা আক্তার ববিতা। চলচ্চিত্রে তাদের দু’জনের পথচলা জহির রায়হানের হাত ধরেই। সাক্ষাতকারটিতে তারা দিয়েছেন জহির রায়হান নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে চাঞ্চল্যকর কিচু তথ্য। তারই স্ত্রী সুচন্দার মুখ থেকে- “দেশ স্বাধীন হওয়ার পর জহির ছবি তৈরী করার কথা বলে একাই বিশেষ বিমানে বাংলাদেশ চলে আসে। তার কাছে মুক্তিযুদ্ধের অসংখ্য ভিডিও ক্লিপ ছিল। এর মধ্যে কিছু কিছু প্রচার করে জহির ব্যাপক সাড়া ফেলেছিল। বাংলাদেশ আসার পর ১৫ দিনের মধ্যে তার কোনো খবর আমরা পাইনি। এদিকে ঘরে খাবার, টাকা-পয়সা নেই। ওই সময় চলচ্চিত্রকার আলমগীর কবীর আমাদের বেশ সহযোগীতা করেন। একদিন শুনলাম, জহিরের বড়ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে বাসা থেকে ধরে নিয়ে গেছে। ভাইকে নিয়ে তিনি ব্যস্ত। ভাইকে খুঁজতে গিয়ে আমাদের কথা তিনি ভুলেই গিয়েছিলেন। আমরা বাংলাদেশে চলে আসি। জহির তার সহকর্মীদের নিয়ে নানা পরিকল্পনা করত। ওই সময় বাসায় টেলিফোন করে মিথ্যা আশ্বাস দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়া হলো। জহির আমাদের কিছুই বলত না। আজও তিনি ফিরে আসেননি। তার মৃতদেহও আমরা পাইনি।
কাউকে কি সন্দেহ হয়, এ প্রশ্নে সুচন্দা বলেন- ‘বিষয়টি আড়ালে রয়ে গেছে, আমি জহিরকে মনের অন্তরালেই রাখতে চাই। সব কথা সবসময় বলা যায় না। যে বিপদটা তার জীবনে এসেছিল। তিনি প্রেসক্লাবে দাঁড়িয়ে এক বক্তব্যে বলেছিলেন, “যারা এখন বড় বড় কথা বলেন------- তাদের মুখোশ আমি খুলে দেব।(প্রাগুক্ত)” একথা বলার পরই তার ওপর বিপদ নেমে আসে।


একই প্রশ্নের জবাবে (তার বোন) ববিতা বলেন, জহির ভাইকে বলা হয়েছিল, তোমার ভাই শহীদুল্লাহ কায়সার জীবিত আছেন। তার চোখ উৎপাটন করে মিরপুর ১১ নম্বর সেক্টরে একটি বাড়ীতে রাখা হয়েছে। তুমি যে তোমার ভাইকে উদ্ধার করতে যাচ্ছ, এটা তোমার পরিবারের সদস্যদের বলো না। তাকে কারা ডেকে নিয়েছিল, এ সম্পর্কে ববিতা বলেন- জহির ভাই যেদিন বাসা থেকে বের হয়ে যান, সেদিন একজন ভারতীয় ব্রিগেডিয়ার তার সঙ্গে ছিলেন এবং ওইদিন রাতেই আমাদের বাসায় ডিনার ছিল। তিনিই আমাদের ফোন করে জানান- সরি, তোমাদের ডিনারে যাওয়া হচ্ছে না। আমি জহিরের সঙ্গে যাচ্ছি। (স্ত্রী) সুচন্দা বলেন- ঘটনার দিন সকালে আমাদের বাসায় একজন লোক আসে। তড়িঘড়ি জহির তার সঙ্গে বেরিয়ে যায়। ওইদিন বাংলাদেশে ভারতের বিখ্যাত অভিনেত্রী নার্গিস, ওয়াহিদা রহমান, লতা মুঙ্গেশকর এফডিসিতে এসেছিলেন। হাসান ইমাম আমাকে ফোন করে বললেন, ম্যাডাম, জহির ভাই কোথায়? আমি বললাম, জহির বাইরে গেছে। তিনি বললেন, জহির ভাই না হলে তো চলবে না। তবে উনি যেহেতু নেই, আপনাকে তো অবশ্যই আসতে হবে। এত বড় বড় শিল্পী এসেছেন, আপনি এবং জহির ভাই না এলে কেমন দেখায়? এফডিসি থেকে আসার পর আমি দেখলাম সবাই বসে রয়েছেন। টেলিফোন সেট সামনে। আমি বাসার লোকজনকে জিজ্ঞাসা করলাম- তোমাদের মেজদা কোথায়? তারা বললো, মেজদা তো মিরপুর গেছেন, আমাদের সঙ্গে নেননি। উনার তো এখনো কোনো খোঁজ নেই। আমি বললাম, খোঁজ নেই মানে? তারা মিরপুর থানায় মেজর মঈন এবং মেজর মতিউর রহমানের সঙ্গে কথা বলি। উনারা জানায়, উনিতো অপারেশনে আমাদের পুলিশ এবং আর্মির সঙ্গে ভেতরে ঢুকেছেন; কিন্তু ওখানে একটু গ-গোল ও গোলাগুলি হয়েছে, উনাকে পাওয়া যাওয়া না। আমি বললাম, উনাকে পাওয়া যাচ্ছে না মানে? তারা আরও জানাল, আমাদের অনেক লোক নিখোঁজ রয়েছে, এ কথা বলেই টেলিফোন রেখে দিলেন। পরবর্তীতে আমিমেজর মঈন এবং মেজর মতিউর রহমানের সঙ্গে দেখা করতে যাই। তাদের কাছে জানতে চাই-জহির কোথায় গেল, কীভাবে গেল? উনারা উত্তর দিতে পারেননি। আমি কাঁদতে কাঁদতে চলে আসি। আমি কল্পনাই করতে পারিনি জহির আর ফিরে আসবে না। অনেক খুঁজেও আমরা জহিরকে পাইনি।’ কারা জহির রায়হানের আরো কতোশত বুদ্ধিজীবীদের হত্যা করে লাশ গুম করে দিয়েছে, তাদের শনাক্ত করা জরুরী। জাতি আজ সেই সত্য জানতে চায়।


মুক্তিযুদ্ধে জহির রায়হানের ভূমিকা এবং পরবর্তীতে তার নিখোঁজ হওয়া প্রসঙ্গে ২৯ জানুয়ারী, ২০১২ তারিখে দৈনিক আমার দেশ পত্রিকায় মনজুরুল হক খানের এক প্রতিবেদনে উল্লেখ হয়, বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণার পর পর যেসব শিল্পী, সাহিত্যিক, বুদ্ধিজীবী ও সংস্কৃতিকর্মী শরণার্থী হয়ে কলকাতায় এসেছিলেন জহির রায়হান তাদের সংগঠিত করে মুক্তিযুদ্ধের সপক্ষে দুটি সংগঠন গড়ে তোলেন। সেই সময় স্বাধীন বাংলা বেতার কেন্দ্রের অনুষ্ঠানেও তিনি নিয়মিত অংশগ্রহণ করেছিলেন। কলকাতায় তাকে বেশ দুঃসহ জীবনযাপন করতে হয়েছিল। স্বীয় অর্থকষ্ট থাকা সত্ত্বেও তিনি ‘জীবন থেকে নেয়া’ চলচ্চিত্রটির ভারতে প্রদর্শনীর বিনিময়ে বিক্রয়লব্ধ সমুদয় অর্থ অস্থায়ী সরকারের তহবিলে দান করেছিলেন। কলকাতায় থাকা অবস্থায় সীমিত সুযোগ-সুবিধা ও নানারকম বাধা-বিপত্তি সত্ত্বেও তিনি সেলুলয়েড মুক্তিযুদ্ধের উপর সঠিক ও সচিত্র দলিল, অনবদ্য সৃষ্টি ‘স্টপ জেনোসাইড’ এবং ‘এ স্টেট ইজ বর্ন’ স্বল্প দৈর্ঘ্যরে ডকুমেন্টারি চলচ্চিত্র দুটির চিত্রনাট্য ও পরিচালনাসহ প্রযোজনাও করেছেন।


বেগম মুশতারী শফি তার ‘স্বাধীনতা আমার রক্তঝারা দিন’ বইটিতে জহির রায়হান প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, সদ্য মুক্ত দেশে এসে যখন শুনলাম, জহির রায়হান নিখোঁজ হয়েছেন তাঁর ভাই শহীদুল্লাহ কায়সারকে খুঁজতে গিয়ে। মুক্তিযুদ্ধ শেষে বিজয়ের পরদিন ১৭ ডিসেম্বর অন্থায়ী সরকারের প্রধানমন্ত্রী তাজউদ্দিন আহম্মেদ ভারতীয় বিমানবাহিনীর বিশেষ হেলিকপ্টারে জহির রায়হানসহ আরও অনেকের ঢাকায় ফিরে আসার ব্যবস্থা করেন। ঢাকায় নেমেই তারা বিজয়ের অপার আনন্দে ক্যান্টনমেন্ট এবং এর আশপাশে পরাজত পাকিস্তানি বাহিনীর আত্মসমর্পনের নানা দৃশ্য ক্যামেরায় ধারণ করে যাচ্ছিলেন। ঘরছাড়ার মতো ক্যামেরা হাতে নিয়ে জহির রায়হান যখন তার টিম সহকারে কাজ করে যাচ্ছিলেন, হঠাৎ কে একজন বলে উঠলেন-বাড়ীর খবর কিছু জানেন? আপনার বড়দা ১৪ তারিখ থেকে নিখোঁজ, রাজাকার-আলবদররা তাকে ধরে নিয়ে গেছে। কথাগুলো শোনার সঙ্গে সঙ্গেই জহির রায়হান পুরনো ঢাকায় কায়েতটুলীর নিজ বাড়ীতে ছুটে গেলেন। কর্ণেল খুরেজা এবং অন্যান্য মুক্তিযোদ্ধাদের সঙ্গে নিয়ে তিনি রায়ের বাজারের বধ্যভূমিতে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছেন শহীদুল্লাহ কায়সারের মৃতদেহ। কিন্তু সবই বৃথা। এরপর জহির রায়হান তাঁর সক্রিয় প্রচেষ্টায় নিজেই আহ্বায়ক হয়ে এনায়েতউল্লাহ খান (প্রয়াত), সৈয়দ হাসান ইমাম, এহতেশাম হায়দার চৌধুরী (প্রয়াত), ব্যারিষ্টার আমিরুল ইসলাম, ব্যারিষ্টার মওদুদ আহমদ, ড. সিরাজুল ইসলাম প্রমূখকে সঙ্গে নিয়ে বেসরকারিভাবে গঠন করেন ‘বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটি। বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্তের কাজে তিনি দিন-রাত অবিরাম ব্যস্ত হয়ে পড়েন। বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটির পক্ষ থেকে ২৫ জানুয়ারী প্রেসক্লাবে এক জনাকীর্ণ সাংবাদিক সম্মেলনে জহির রায়হান দ্ব্যর্থহীন কন্ঠে বলেছিলেন, ‘বুদ্ধিজীবী হত্যার অনেক রহস্য উদঘাটিত হয়েছে। আমাদের কাছে এমন অনেক তথ্য ও প্রমাণ আছে, যা প্রকাশ করলে অনেকের মুখোশ খুলে যাবে। সময় বুঝে আমি একেক করে সব প্রকাশ করবো।’ ৬-১২ ফেব্রুয়ারী ১৯৮৯-এর সাপ্তাহিক ‘এখনই সময়’ থেকে জানা যায়, অনেক ক্ষমতাধর ব্যক্তি জহির রায়হানের সেদিনের সাংবাদিক সম্মেলনের স্পষ্ট বক্তব্যে তুষ্ট হননি। কেননা, তিনি তাদের কর্মকাণ্ডের অনেক কিছুই জানতেন। মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে অনেক দুর্লভ তথ্য তিনি ক্যামেরাবন্দি করে রেখেছিলেন। সংগ্রহ করেছিলেন অনেক ডকুমেন্টস। মুখোশ খুলে যাওয়ার ভয়েই কী জাহির রায়হানকে সরিয়ে দিয়েছে নাকি অন্য কোনো দেশের চক্রান্ত? মাঝে মধ্যেই শোনা যায়, জহির রায়হান মরেনি। তাকে এখান থেকে তুলে নেয়া হয়েছে। তিনি ভিন্ন একটি দেশের জেলে আটকা রয়েছেন। ঠিক যেমন সেক্টর কমা-ার মেজর জলিলকে তুলে নিয়ে দীর্ঘদিন ভারতে আটকে রাখা হয়েছিল। ১৯৭২ সালের জানুয়ারী মাসের শেষদিকে জহির রায়হানকে কেউ একজন পরামর্শ দিয়েছিল, আজমীর শরীফ গেলে সেখান থেকে বলে দেয়া হবে ‘আপনার বড়দা কোথায় আছেন।’ পরামর্শানুযায়ী জহির রায়হান তার পরিবারসহ আজমীর শরীফ গিয়েছিলেন। ২৭ জানুয়ারী আজমীর শরীফ থেকে ঢাকায় ফিরে তিনি জানালেন, ‘আমি জেনে এসেছি আমার বড়দা বেঁচে আছেন।’ ২৮ জানুয়ারী সকালে জনৈক রহস্যজনক ব্যক্তি জহির রায়হানকে কায়েতটুলীর বাড়িতে ফোন করে জানান, ‘শহীদুল্লাহ কায়সার এখনও জীবিত রয়েছেন এবং তাকে মিরপুর ১২নং সেকশনের একটি বাড়িতে আটকে রাখা হয়েছে। তাকে যেন অবিলম্বে উদ্ধারের ব্যবস্থা করা হয়। জহির রায়হান তার বড়দাকে ফিরে পাওয়ার জন্য অস্থির হয়ে পড়েন।


১৯৯৩ সালের ৮ ডিসেম্বর ‘দৈনিক আজকের কাগজে’ দেয়া জহির রায়হানের প্রথমা স্ত্রী সুমিতা দেবীর একটি সাক্ষ্যৎকার থেকে জানা যায়- “জহির রায়হান নিখোঁজ এই নিয়ে পত্র-পত্রিকায় বেশ লেখালেখি হলো। একদিন বড়দি অর্থাৎ জহির রায়হানের বড়বোন নাসিমা কবিরকে ডেকে নিয়ে শেখ মুজিব বললেন, ‘জহিরের নিখোঁজ হওয়া নিয়ে এরকম চিৎকার করলে তুমিও নিখোঁজ হয়ে যাবে।’ পরে নাসিমা আর কিছু বলেনি। টেলিফোন করেছিল যে রফিক, তাকে নিয়ে যখন পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি শুরু হলো তখন তাকে নাগরিকত্ব দিয়ে পুরো পরিবারসহ আমেরিকায় পাঠিয়ে দেয়া হলো। এই ঘটনা জহিরের নিখোঁজ হওয়া সম্পর্কে রফিকের ভূমিকাকে আরও সন্দেহযুক্ত করে তোলে আমার কাছে।’
‘সাপ্তাহিক ২০০০’ (১৩ আগষ্ট, ১৯৯৯) এর প্রচ্ছদ প্রতিবেদনের শেষাংশে জহির রায়হানের সন্তান অনল রায়হান প্রতিবেদক হয়ে কিছু বক্তব্য উত্থাপন করেছেন, ‘জহির রায়হানের পরিবারের সদস্যদের অনেকেরই দৃঢ় ধারণা, মিরপুরের ওই ঘটনার পেছনে রয়েছে পরিকল্পিত চক্রান্ত। জহির রায়হান সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশের মন্ত্রিসভায় ঠাঁই করে নেয়া অনেক মন্ত্রীর মুক্তিযুদ্ধের সময়ে বিতর্কিত ভূমিকা নিয়ে অনেক দুর্লভ ডকুমেন্টস সংগ্রহ করেছেন বলে তিনি এক প্রেস কনফারেন্সে বলেছিলেন।ওই হুমকিই তাঁর জীবনের জন্য পাল্টা হুমকি হয়ে ছিল কি না কে বলবে?’


জহির রায়হান স্বীয় ভ্রাতা শহীদুল্লাহ কায়সার হত্যা তদন্তে স্বদ্যোগে যে কমিটি গঠন করেছিলেন এবং সরেজমিনে তদন্ত শেষে যে রিপোর্ট পেশ করেছিলেন তার কারণেই ৩০ জানুয়ারী, ১৯৭২ ইং তারিখে খোদ বঙ্গবন্ধুর শাসনকালে তিনি চিরতরে নিখোঁজ হন। রিপোর্টে স্পষ্ট উল্লেখ হয়, ‘তথাকথিত রাজাকার বা আলবদরের সদস্যরা বুদ্ধিজীবি হত্যার সাথে জড়িত ছিলেন না।’ বিশিষ্ট ইতিহাস গবেষক অধ্যাপক মুনতাসীর মামুন তার গ্রন্থে তা ব্যাখ্যা করেছেন এভাবে, “১৯৭১ সালে গঠিত বুদ্ধিজীবী হত্যা তদন্ত কমিটির আহবায়ক চলচ্চিত্রকার জহির রায়হান খানিকটা আলোকপাত করেছিলেন। ভারতের সাপ্তাহিক ‘নিউ এজ’ পত্রিকায় ১৯৭২ সালের জানুয়ারীতে এক সাক্ষ্যৎকারে জানান- ‘আলবদরদের কার্যকলাপ অনুসন্ধান করতে যেয়ে আমরা এই সাথে অপরাধীদের প্রকৃত উদ্দেশ্য বুঝবার জন্য নানা প্রশ্নের উত্তর খুঁজেছি। স্বাধীনতা পরবর্তীকালে যখন নিহত বাবা ও ভাইয়ের দেহের অবশেষ ঢাকায় বধ্যভুমিতে খুঁজে ফিরছিলাম তখন আমাদের ধারণা ছিল যে দখলদার পাকিস্তানি শাসকদের নিশ্চিত পরাজয় উপলব্ধি করে সন্ত্রস্ত গোড়া ধর্মধ্বজী পশুরা ক্রোধান্ধ হয়ে কাপুরুষোচিত হত্যাকান্ডের মাধ্যমে প্রতিহিংসাবৃত্তি চরিতার্থ করেছে। কিন্তু পরে বুঝেছি ঘটনা তা ছিল না। কেননা এই হত্যাকান্ডের শিকার যারা হয়েছেন তারা বাঙ্গালী বুদ্ধিজীবীদের প্রতিনিধি স্থানীয় এবং সা¤্রাজ্যবাদ বিরোধী মনোভাবের জন্য সুপরিচিত ছিলেন।”(মুনতাসীর মামুন, মুক্তিযুদ্ধ সমগ্রঃ দুই, পৃষ্ঠা-১৮২, ঢাকাঃ সুবর্ণ প্রকাশনী- ২০১১)। অর্থাৎ জহির রায়হান এ রিপোর্টের মাধ্যমে শুধুমাত্র শহীদুল্লাহ কায়সারের নয় বরং ১৪ই ডিসেম্বর ১৯৭১ তারিখে শহীদ সকল বুদ্ধিজীবীদের প্রকৃত ঘাতকদের মুখোশ খুলে দিতে চেয়েছিলেন। এতে বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সম্পুর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন ইতিহাসটাই পাল্টে যেত। মুক্তিযোদ্ধা নামে অবৈধ স্বার্থ হাসিলের পথও চিরতরে বন্ধ হয়ে যেতো। তথাকথিত দালাল আইনে প্রচলিত বিচার প্রক্রিয়া মিথ্যা প্রমাণ হতো।


বিশিষ্ট সাংবাদিক ও সংগঠক নির্মল সেন তার ‘আমার জবানবন্দি’ গ্রন্থের ৪০৫-৪০৬ পৃষ্ঠায় লিখেছেন, “জহির রায়হান নিরুদ্দেশ হওয়া নিয়ে নতুন তথ্য শোনা গেছে। বলা হয়েছে- পাকিস্তানি হানাদার বা অবাঙ্গালিরা নয়, মুক্তিযোদ্ধাদের একটি অংশই জহির রায়হানকে খুন করেছে। মুক্তিযোদ্ধাদের এ অংশটির লক্ষ্য ছিল- বাংলাদেশকে স্বাধীন করা এবং সঙ্গে সঙ্গে বামপন্থি বুদ্ধিজীবীসহ সামগ্রিকভাবে বামপন্থি শক্তিকে নিঃশেষ করে দেয়া। এরা নাকি বামপন্থি বুদ্ধিজীবীদের হত্যার একটা তালিকা প্রণয়ন করেছিল। এদের ধারণা এ তালিকাটি জহির রায়হানের হাতে পড়েছিল। জহির রায়হানও জানত তার জীবন নিরাপদ নয়। তবুও সে ছিল ভাইয়ের শোকে মুহ্যমান। তাই শহীদুল্লাহ কায়সারের নাম শুনেই সে ছুটে গিয়েছিল মিরপুরে তারপর আর ফিরে আসেনি। এ মহলই তাকে ডেকে নিয়ে খুন করেছে।
জহির রায়হানের নিখোঁজ প্রসঙ্গে উদ্ধৃত তথ্যসমূহ থেকে উল্লেখিত হত্যাকান্ডের চিত্র হুবহু মিলে গেছে। এখানে চারজন বুদ্ধিজীবীর নিথর দেহগুলো পড়ে থাকতে দেখা যাচ্ছে। সবার পরনেই রয়েছে প্যান্ট, শার্ট ও টাই। ঘটনাটি যেহেতু ১৯৭১ এর ১৯ ডিসেম্বর তথা বিজয়ের ঠিক তিনদিন পর। এ ঘাতকেরাই জহির রায়হানসহ সকল বুদ্ধিজীবীদের নির্মমভাবে হত্যা করেছে। দেশের প্রত্যন্ত এলাকার প্রভাবশালী ও ইসলামী ব্যক্তিত্বকে রাজাকার হিসেবে উপরোক্ত পদ্ধতিতে হত্যা করেছে। আর ভারতীয় সেনাবাহিনীর সহায়তায় অতি সহজেই উক্ত ঘৃণ্য অপরাধের দায়ভার পাকবাহিনী ও তথাকথিত রাজাকার আলবদরদের নামে চালাতে সমর্থ হয়েছে।


লেখক নুরুজ্জামান মানিক এ প্রসঙ্গে উল্লেখ করেছেন, ‘৭১ সালের ডিসেম্বরে বিজয় লাভের পরেও বুদ্ধিজীবীদের নিধন অব্যাহত থাকে। দৃষ্টান্তস্বরূপ ড, মনসুর আলী (ডিসে ২১, ১৯৭১) চলচ্চিত্রকর জহির রায়হান (নিখোঁজ হন ৩০ জানু, ১৯৭২) এবং সাংবাদিক গোলাম রহমান (হত্যা জানু ১১, ১৯৭২)। দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্য, ‘৭১ সালে বুদ্ধিজীবী হত্যাকান্ড শুরু হয়ে এখনো তা চলছে।” (নুরুজ্জামান মানিক, স্বাধীনতা যুদ্ধের অপর নায়কেরা, পৃষ্ঠা-৭৭, ঢাকাঃ শুদ্ধস্বর প্রকাশনী, ২০০৯)। 
অতএব, সুস্পষ্ট যে, তথাকথিত মুক্তিযোদ্ধারাই জহির রায়হানসহ সকল শহীদ বুদ্ধিজীবীদের মূল ঘাতক আর শহীদ ও বুদ্ধিজীবীগণ অসহায় রাজাকারি পরিণতিপ্রাপ্ত।
এ্যডভোকেট, ঢাকা।

ONN TV
payoneer
নিউজ আর্কাইভ
সর্বাধিক পঠিত
সখিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ ব্যাপী ক্রীড়া ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান
ক্রীড়া ও পুরস্কার বিতরণী অনুষ্ঠান

সাতক্ষীরা  প্রতিনিধি: সখিপুর ইউনিয়নের সখিপুর মাধ্যমিক বিদ্যালয়ে ২ দিনব্যাপী ক্রীড়া, কুইজ, রচনা প্রতিযোগীতা অনুষ্ঠিত হয়েছে। বে-সরকারি প্রতিষ্ঠা

জেলা পরিষদের সদস্য প্রাথী শাপলার গনসংযোগ
জেলা পরিষদের সদস্য প্রাথী শাপলার গনসংযোগ

সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: বিভিন্ন ইউনিয়ন পরিষদের সদস্য ও ইউপি চেয়ারম্যানদের সাথে গনসংযোগ করেছেন জেলা পরিষদের সদস্য প্রার্থী সোনিয়া পারভীন শাপলা। সোমবার

দেবহাটা রিপোর্টাস ক্লাবের নবগত নির্বাহী অফিসারের সাথে ফুলের শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়
 শুভেচ্ছা ও মতবিনিময়

দেবহাটা প্রতিনিধি: দেবহাটা উপজেলা নবগত নির্বাহী কর্মকর্তার সাথে ফুলের শুভেচ্ছা জানিয়েছেন দেবহাটা রিপোর্টাস ক্লাবের নের্তৃবৃন্দরা। সোমবার দুপুরে নির

দেবহাটায় ছাত্রলীগের ৪দলীয় ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট
৪দলীয় ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট

মীর খায়রুল আলম, সাতক্ষীরা প্রতিনিধি: দেবহাটায় ছাত্রলীগের উদ্যেগে ৪দলীয় ক্রিকেট টুর্ণামেন্ট অনুষ্ঠিত হয়েছে। শুক্রবার বিকালে উপজেলার গোপাখালি মাঠে দে

দেবহাটায় ইএনও’র বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন
দেবহাটায় ইএনও’র বিভিন্ন প্রকল্প পরিদর্শন

মীর খায়রুল আলম:: দেবহাটা উপজেলাকে মডেল করতে ছুটির দিনে উপজেলার বিভিন্ন প্রকল্পের কাজ পরিদর্শন করেন উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা হাফিজ আল-আসাদ। শুক্রবা

শিরোনাম